পদ্মা ব্যারেজ কী কাজে লাগবে
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে প্রাণদান এবং দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের পানির সংকট দূর করতে বিশাল এক মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের বৃহত্তম ‘ব্যারেজ'।
৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি আগামী সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি আগামী সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
একনজরে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প:
নির্মাণস্থল: রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা।
ব্যয়: প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
দৈর্ঘ্য: ২.১ কিলোমিটার (থাকছে ৭৮টি স্পিলওয়ে ও ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দু'টি ফিশ পাস রাখা হবে)।
লক্ষ্য: ৫টি প্রধান নদী পুনরুজ্জীবিত করা এবং ২৪ জেলার পানিসংকট নিরসন।
সময়সীমা: ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের সমাপ্তি।
ব্যারেজ কী?
ব্যারেজ হলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত বিশেষ একটি অবকাঠামো। ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর পার্থক্যে হলো বাঁধের মাধ্যমে সাধারনথ জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি ধরে রাখা হয়।
অন্যদিকে ব্যারেজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোতে একাধিক দরজা রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।
সাধারণত ব্যারেজ নির্মাণের আগে উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। এরপর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওইসব খালে পানি ঢোকানো হয়। সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ আকারে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় ব্যারেজের মাধ্যমে এক নদীর পানি অন্য নদীতে নিয়ে সেটির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে সেটিই করার পরিকল্পনা করছেন কর্মকর্তারা।
কেন পদ্মা ব্যারেজ, কী কাজে লাগবে?
সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তীব্র খরা ও লবণাক্ততা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারেজ হবে একটি ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রকল্প। এর মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই, মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, বড়াল ও ইছামতী নদীতে পানি প্রবাহ বাড়ানো হবে।
এক্ষেত্রে ব্যারেজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ওইসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এরপর সেই পানি দিয়ে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর অঞ্চলে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া হবে বলে প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেটি সম্ভব হলে এসব অঞ্চলে ধান এবং মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা। নদী তীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল, সেদিকের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে, এই পদ্মা ব্যারেজ করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বেনিফিটটা আমরা ওই অঞ্চলের মানুষকে দিতে পারবো, সেটা কৃষিখাতে হোক, সুন্দরবনের জন্য হোক, বলেও জানান পানিসম্পদমন্ত্রী।
প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা পাবে এবং সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সরকার আশা করছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এতে বার্ষিক ধান উৎপাদন ২৪ লাখ টন এবং মাছের উৎপাদন সোয়া দুই লাখ টন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পেও পানির সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: বিদ্যুৎকেন্দ্র ও স্যাটেলাইট শহর
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ব্যারেজকে কেন্দ্র করে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নদীর তীরে সাতটি আধুনিক ‘স্যাটেলাইট শহর’ গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সবমিলিয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা।
গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে বিভিন্ন সময় এই ব্যারেজ নির্মাণের সমীক্ষা চললেও বর্তমান সরকার এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।