সোমপুর বৌদ্ধবিহার। বদলগাছি, নঁওগা৷
বাংলাদেশে ইউনেস্কো ঘোষিত তিনটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট রয়েছে- এর একটি হলো সোমপুর মহাবিহার, যা নঁওগায় অবস্থিত। ১৯৮৫ সালে স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারটি বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন।
প্রাচীন বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে, আজকের সোমপুর মহাবিহার-পাহাড়পুর। কখনো ছিল জ্ঞান, ধর্ম আর সংস্কৃতির এক দীপ্ত আলোকস্তম্ভ। এখন তার ভগ্নপ্রায় ইটের শরীর নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেও, ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক মহিমান্বিত উত্থান আর দীর্ঘ, বেদনাময় পতনের কাহিনি।
৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি একদিন, দূর চীন থেকে আগত পরিব্রাজক হিউয়েন সাং পা রাখেন পুন্ড্রবর্ধনের মাটিতে। তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অনেক কিছুই লিখে গেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়-সেখানে সোমপুরের কোনো বিহার বা মন্দিরের উল্লেখ নেই। যেন তখনও ইতিহাসের মঞ্চে তার আবির্ভাব ঘটেনি। হয়তো সে সময়ের অন্ধকারে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল, একটি উপযুক্ত যুগের জন্য।
এরপর ধীরে ধীরে সময় বদলায়। বাংলার আকাশে উদিত হয় পাল সাম্রাজ্য-এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সেই সময় সিংহাসনে বসেন ধর্মপাল, গোপালের পুত্র। ৭৮১ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া তাঁর শাসন বিস্তৃত হয় বাংলা ও বিহার পেরিয়ে সুদূর গান্ধার পর্যন্ত। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ইতিহাসে সুপরিচিত। অনেকে মনে করেন, তাঁরই উদ্যোগে গড়ে ওঠে সোমপুর মহাবিহার এবং বিক্রমশীলা।
তবে ইতিহাস সবসময় একমুখী নয়। তিব্বতের প্রাচীন গ্রন্থ পাগ সাম জোন ঝাং-এর লেখক আবার ভিন্ন কথা বলেন। তাঁর মতে, ধর্মপালের পুত্র দেবপাল-ই এই বিশাল বিহার ও সুউচ্চ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। নির্মাতা যিনিই হোন, এতে কোনো সন্দেহ নেই-সোমপুর খুব দ্রুতই হয়ে ওঠে বৌদ্ধ শিক্ষার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র।
সেই সময়ের চিত্র কল্পনা করলে দেখা যায়-বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে ভিক্ষুরা চলাফেরা করছেন, পাঠ চলছে, বিতর্ক হচ্ছে, দূর-দূরান্ত থেকে আগত পণ্ডিতদের সমাগম। এখানকার ভিক্ষুরা দান পাঠাতেন নালন্দা মহাবিহার, বুদ্ধগয়া এবং অন্যান্য তীর্থস্থানে-অর্থ, রত্ন, মূল্যবান উপঢৌকন। দশম ও একাদশ শতাব্দীর সেই দান-অনুদান আজও সাক্ষ্য দেয় এই প্রতিষ্ঠানের ঐশ্বর্য ও প্রভাবের।
পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে আরও বহু বিহার-অগ্রপুর, উষ্মপুর, গোটপুর, এতপুর, জগদ্দল-যেন জ্ঞানের এক নক্ষত্রমণ্ডল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্বলছিল সোমপুর।
কিন্তু ইতিহাসের স্রোত কখনো স্থির থাকে না।
নবম শতাব্দীর শেষভাগে আঘাত আসে। গুর্জর রাজা প্রথম ভোজ এবং মহেন্দ্র পাল-এর আক্রমণে পাল সাম্রাজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সময়ের ঝড় সামলে কিছুটা শক্তি ফিরে পান মহীপাল (৯৯৫–১০৪৩ খ্রি.), যিনি সোমপুর মহাবিহারের সংস্কারও করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আবার শুরু হয় অস্থিরতা।
একের পর এক আঘাতে কেঁপে ওঠে জনপদ। চেদীরাজ কর্ণ, চোল সম্রাট রাজেন্দ্র চোল, আর কৈবর্ত সামন্ত দিব্বো-বরেন্দ্রভূমিতে আঘাত হানেন। এই অশান্ত সময়েই সম্ভবত ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসে নালন্দা ও পাহাড়পুরে। আগুনের লেলিহান শিখা, লুটপাটের উন্মত্ততা, রক্তাক্ত সংঘর্ষ-সব মিলিয়ে জ্ঞানের কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।
একাদশ শতকে আবার একবার আশা জাগান রামপাল। তিনি কিছুটা স্থিতি ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু সেই শান্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী। দ্বাদশ শতকে দক্ষিণ ভারত থেকে আগত সেন রাজারা বাংলার ক্ষমতা দখল করলে পালদের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়। তখন থেকেই সোমপুর মহাবিহার হারাতে শুরু করে তার প্রাণ, তার জৌলুস।
যে প্রাঙ্গণে একসময় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ত, সেখানে ধীরে ধীরে নেমে আসে নীরবতা।
এই পতনের পেছনে ছিল অনেকগুলো কারণ। বাহ্যিক আক্রমণ যেমন ছিল, তেমনি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ছিল প্রবল। বিশেষ করে মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি-র অভিযানের ফলে নালন্দা ও অন্যান্য বিহারে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। যদিও সোমপুরে তাঁর সরাসরি আক্রমণের বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নিয়ে বিতর্ক আছে, তবুও সেই সময়ের সহিংসতা গোটা অঞ্চলের বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে গভীরভাবে আঘাত করে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় শাসকদের সংঘর্ষ এবং অবহেলা-এসবের মাঝেও দুর্বল হয়ে পড়ে এই বিশাল প্রতিষ্ঠান। কোথাও কোথাও এমন কথাও শোনা যায়, কোনো এক স্থানীয় শাসকের আক্রমণে মঠাধ্যক্ষ নিহত হন। যেন সেই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে প্রতিষ্ঠানের শেষ ভরসাটুকু।
এভাবেই, সময়ের ধুলোর নিচে চাপা পড়ে যেতে থাকে সোমপুর। হারিয়ে যায় অসংখ্য পুঁথি, শিলালিপি, শিল্পকর্ম-জ্ঞানের এক অমূল্য ভাণ্ডার বিলীন হয়ে যায় অতলে।
তবুও ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারায় না।
উনবিংশ শতাব্দীতে, ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালে এখানে খননকার্য শুরু করেন। যদিও জমিদারদের বাধায় তা সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র গবেষণা পরিষদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আবার শুরু হয় খনন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বহু গবেষকের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় সোমপুরের স্থাপত্য-তার সিঁড়ি, প্রাচীরচিত্র, আর সুপরিকল্পিত গঠন।
এরপরও থেমে থাকেনি অনুসন্ধান। ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় পর্যন্ত চলে খনন ও গবেষণা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে নতুন করে সংরক্ষণ ও খনন কার্যক্রম চালায়। জলাবদ্ধতা দূর করা, কাঠামো সংরক্ষণ-এসব প্রচেষ্টায় যেন আবার একটু প্রাণ ফিরে পায় এই প্রাচীন নিদর্শন।
আজ পাহাড়পুরের সেই ধ্বংসাবশেষ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে-অতীতের এক অনড় সাক্ষী হয়ে। এখানে কোনো হঠাৎ পতনের গল্প নেই, নেই একদিনে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার চিহ্ন। বরং এটি সময়ের দীর্ঘ ছায়া-আক্রমণ, অবহেলা আর পরিবর্তনের ধীর অথচ নিশ্চিত ছাপ।

No comments:
Post a Comment