May 17, 2026

মহানগর যুবদলের নেতৃত্বের আলোচনায় রাজপথের পরীক্ষিতরা

 মহানগর যুবদলের নেতৃত্বের আলোচনায় রাজপথের পরীক্ষিতরা


জাতীয়তাবাদী যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংগঠনের অভ্যন্তরে এখন চলছে ব্যাপক আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্বে দেখতে চান তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
তাদের প্রত্যাশা—পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত হবে নতুন নেতৃত্ব।

বিশেষ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।

 দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা সাবেক ছাত্রনেতা, রাজপথের লড়াকু সংগঠক এবং যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম উঠে আসছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সভাপতি পদে যাদের নাম আলোচনায়
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সম্ভাব্য সভাপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মহানগর দক্ষিণের বর্তমান সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নকে ঘিরে।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, তিনি শুধু মহানগর দক্ষিণ নয়, কেন্দ্রীয় যুবদলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। অনেকেই মনে করছেন, তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদেও যেতে পারেন।

রবিউল ইসলাম নয়ন বাংলানিউজকে বলেন, আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। দলের প্রধান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমার অভিভাবক। তিনি আমাকে দলের একজন সাধারণ সদস্য বানালেও আমি দলের হয়ে কাজ করব।

তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলন এবং দীর্ঘ ১৭ বছর যারা ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের ব্যানারে থেকে রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, তারেক রহমানের নির্দেশ পালন করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করে কমিটি গঠন করলে ভালো হয়।

সভাপতি পদে আরও আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ গাফফার, যুগ্ম আহ্বায়ক নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক মুন্না এবং বর্তমান আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজলও সভাপতি পদে আলোচিত নাম। দীর্ঘদিন ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই নেতাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান তৃণমূলের একটি বড় অংশ।

ফয়সাল আহমেদ সজল বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি করেছি। ফ্যাসিস্ট আমলের ১৭টি বছর এবং জুলাই আন্দোলনসহ দীর্ঘদিন দলের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। দল যদি আমার ওপর আস্থা রাখে, তাহলে দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তবে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যেখানে মূল্যায়ন করবে, সেখানেই দায়িত্ব পালন করব।

সাধারণ সম্পাদক পদে যারা আলোচনায়
সাধারণ সম্পাদক পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক সাবা করিম লাকি, ফয়সাল হেদায়েত সৈকত পণ্ডিত, রাফিজুল হাই রাফিজ, মো. জিন্নাহ, আসাদুজ্জামান আসলাম, আসিফুর রহমান বিপ্লব এবং পল্টন থানার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খলিল মৃধা।

সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা এবং কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে তাদের অনেককেই সাধারণ সম্পাদক পদে এগিয়ে রাখছেন নেতাকর্মীরা।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জিন্নাহ বাংলানিউজকে বলেন, যারা দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনাবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, পাশাপাশি তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে সুদৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন—এমন নেতৃত্বই আসা উচিত বলে আমি মনে করি।

তিনি আরও বলেন, একটি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেতা ও কর্মীদের মধ্যে সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করা এবং তাদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে দলগতভাবে কাজ করানো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু জায়গায় দেখা যাচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসররা যুবদলে অনুপ্রবেশ করছে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পল্টন থানার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খলিল মৃধা বলেন, আগামী যুবদলের কমিটিতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতৃত্বই মূল্যায়িত হবে বলে আমরা আশাবাদী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেছিলেন, যে কর্মী শেষ পর্যন্ত রাজপথে থাকবে, সে অবশ্যই মূল্যায়িত হবে।

খলিল মৃধা আরও বলেন, আমরা শুধু মিছিলের প্রথম সারিতে থেকেই নয়, ঢাকা শহরের দৃশ্যমান আন্দোলন-সংগ্রামেও ভূমিকা রেখেছি। তাই আগামী মহানগর ও কেন্দ্রীয় যুবদলের কমিটিতে আমরা মূল্যায়নের প্রত্যাশা করি।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬-১৭ বছরে অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরাও। একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমরা চাই, প্রতিটি ত্যাগী পরিবার ও নেতাকর্মীর যথাযথ মূল্যায়ন হোক। সরকারের প্রধান ও আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ। দলের জন্য আমরা জীবন বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত।

যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তাদের মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক মুন্না বলেন, যারা দীর্ঘদিন জেল-জুলুম সহ্য করে রাজপথে থেকেছেন, তাদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। পরীক্ষিত নেতাদের দায়িত্ব দিলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।

উত্তর যুবদলের নেতৃত্বে যাদের নাম আলোচনায়
সভাপতি পদে বর্তমান সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজ, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক তসলিম আহসান মাসুমের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান রাজ, বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাসান টিটু এবং মনিরুল ইসলাম স্বপন।

সাধারণ সম্পাদক পদে যারা আলোচনায় রয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের রামপুরা থানার আহ্বায়ক কামাল আহমেদ দুলু। ফ্যাসিস্ট সরকার আমলে দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে ৭৭টি মামলা হয়েছে।

এছাড়া উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান রুয়েল, যিনি দীর্ঘদিন গুম থাকার পর ফিরে এসেছেন, তার নামও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিনুল হক হিমেল, আইয়ুব আলী এবং যুগ্ম আহ্বায়ক জুলহাস আহমেদের নামও শোনা যাচ্ছে।

কামাল আহমেদ দুলু বাংলানিউজকে বলেন, দুইটি মামলায় সাজা হয়েছিল। দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছি। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ৭৭টি মামলা খেয়েছি। তবুও স্বৈরাচার শেখ হাসিনার লালচক্ষুর রাঙানি ভয় পাইনি। দলের জন্য কাজ করে গেছি। দলের নেতা তারেক রহমানের প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলেছি। দল আমাকে যেখানে মূল্যায়ন করবে, সেখান থেকেই কাজ করে যাব।

৩৩ মাসেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি
২০২৩ সালের ৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণে খন্দকার এনামুল হক এনামকে আহ্বায়ক এবং রবিউল ইসলাম নয়নকে সদস্যসচিব করা হয়।

পাশাপাশি এম এ গাফফার, ইকবাল হোসেন ও মুকিত হোসেনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছিল।

তবে প্রায় ৩৩ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয়নি। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হলেও সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। কেন্দ্রীয় যুবদল এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, শুধু ঢাকা মহানগর নয়, দেশের সব জেলা ও মহানগর কমিটি নিয়েই আমরা ভাবছি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

দলীয় নেতারা মনে করছেন, উত্তর ও দক্ষিণ দুই ইউনিটেই অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটানো গেলে সংগঠন আরও গতিশীল হবে।

তৃণমূলের প্রত্যাশা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের মতে, যুবদলের এই পুনর্গঠন রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। বিশেষ করে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করা গেলে সংগঠন আরও চাঙ্গা হবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, এবার কোনো ধরনের ‘পকেট কমিটি’ নয়; বরং আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, কর্মীবান্ধব, সাহসী ও বিতর্কমুক্ত নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

তাদের মতে, আগামী দিনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুবদলের নেতৃত্বে এমন নেতাদের প্রয়োজন, যারা শুধু পদধারী নন, বরং কঠিন সময়ে সংগঠনের পতাকা ধরে রেখেছেন।

দলীয় সূত্র বলছে, পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই প্রায় শেষ পর্যায়ে। খসড়া তালিকাও ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সবুজ সংকেত পেলেই যেকোনো সময় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হতে পারে।


No comments: