সত্যিই কি চেঙ্গিস খান 'খোদার গজব
সত্যিই কি চেঙ্গিস খান 'খোদার গজব' ছিল? নাকি এটা সুচতুর একটা সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ছিল?
আজ থেকে ৭০০ বছর আগে অশিক্ষিত যাযাবর চেঙ্গিস বাহিনী যেভাবে ভয় এবং ত্রাসের মাধ্যমে মুসলিমদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে পরাজিত করেছিল, আজকের দুনিয়াও আমরা তার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। ছোট ছোট জাতি, বিশাল বিশাল জনগোষ্ঠীকে ত্রাসের মাধ্যমে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে।
ইতিহাস কেবলই গজব আর অলৌকিকতার হিসাব নয়, এর পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। মঙ্গোলদের প্রবল উত্থানের পেছনে যুগে যুগে যাযাবরদের হাতে শহরবাসীর ধরাশায়ী হবার খালদুনীয় তত্ত্বেরই একটি রূপায়ন আমরা দেখি মূলত।
(গত পর্বের পর...)
ইউরেশিয়ার এক বিশাল চারণভূমি থেকে উঠে আসা সর্বশেষ আক্রমণকারী যাযাবর জাতি ছিল মঙ্গোলরা। হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলটি পর্যায়ক্রমে এমন সব যাযাবর বিজেতাদের জন্ম দিয়েছে, যারা চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের স্থায়ী সভ্যতাগুলোর ওপর বারবার হামলে পড়েছে। জিয়ংনু, হুন এবং গোকতুর্কদের মতো পূর্বসূরিদের মতোই মঙ্গোলরাও একই রকম সম্প্রসারণবাদী কৌশল এবং সামরিক পদ্ধতি ব্যবহার করত।
কিন্তু মঙ্গোলরা ছিল একেবারেই আলাদা। তাদের অবিশ্বাস্য গতি, বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলের ক্ষমতা এবং নিখাঁদ সামরিক দক্ষতার বলে তারা হয়ে উঠেছিল এই যাযাবর অঞ্চল থেকে উঠে আসা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর পরাশক্তি।
১২১৮ সাল। মিসরের দামিয়েতা বন্দর অবরোধ করে পঞ্চম ক্রুসেড। যদিও মাত্র কয়েক বছরের মাথায় এই ক্রুসেড চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ঠিক একই বছরে, মুসলিম বিশ্বের পূর্ব সীমান্তে এসে দাঁড়ান চেঙ্গিস খান। খাওয়ারিজমীয় সাম্রাজ্যের শাহ দ্বিতীয় মুহাম্মদের কাছে তিনি এক চরমপত্র পাঠান— হয় বশ্যতা স্বীকার করো, নয়তো ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত হও।
কোন কারণে ওতরার শহরের খাওয়ারিজমীয় গভর্নর ইনালচুক একটি পুরো মঙ্গোল বাণিজ্য কাফেলাকে হত্যা করেন। এর মধ্যে চেঙ্গিস খানের একজন দূতও ছিলেন। দাবি করা সত্ত্বেও এই ঘটনায় ইনালচুকের বিচার না পেয়ে এই আল্টিমেটাম দেন চেঙ্গিস। শাহ এই চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করেন।
শেষ পর্যন্ত একে এক মোক্ষম অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেন চেঙ্গিস খান। কয়েক বছরের মধ্যেই বুখারা, সমরকন্দ, নিশাপুর এবং মার্ভ শহরের ওপর দিয়ে মঙ্গোল টর্নেডো বয়ে যায়।
প্রাণ বাঁচাতে শাহ কাস্পিয়ান সাগরের দিকে পালিয়ে যান এবং নির্বাসিত অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। আর গভর্নর ইনালচুককে বন্দি করে তার চোখে ও কানে গলিত রুপা ঢেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে মঙ্গোলরা।
\\=\\
চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর কয়েক বছর পর, ১২২৯ সালে তার ছেলে ওগেদাইয়ের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা ফের পশ্চিমমুখী আগ্রাসণ শুরু করে। ১২৪০-এর দশকের মধ্যেই তারা পারস্য এবং এর আশপাশের বড় একটি অংশ দখল করে নেয়।
এরপর আনাতোলিয়ার সেলজুকদের পরাজিত করে তাদের একটি করদ রাজ্যে পরিণত করে। পাশাপাশি সিরিয়া এবং আধুনিক ইরাকের কিছু অংশে শুরু হয় ধারাবাহিক অভিযান।
তবে মুসলিম বিশ্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ১২৫৮ সালে। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান বাগদাদ ধ্বংস করেন। শহরের জনসংখ্যাকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।
পরাজিত খলিফা আল-মুসতাসিমকে মঙ্গোলদের ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি গালিচায় মুড়িয়ে ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আব্বাসীয়দের ৫০০ বছরের শাসনের অবসান হয়।
মাত্র ৪০ বছরে বিপুল এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা পুরো মুসলিম বিশ্বে এক তীব্র আতঙ্কের ঢেউ তোলে। অভাবনীয় নিষ্ঠুরতার গল্পগুলো ছড়িয়ে পড়ে মুখে মুখে। সে সময়ের ঐতিহাসিক বিবরণগুলোতে লাখো মানুষের মৃত্যু এবং মঙ্গোলদের ভয়াবহ ও নির্মম সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
আজকের পাঠকদের কাছে এসব বিবরণ হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে সমসাময়িক মুসলিম ও খ্রিস্টানদের কাছে মনে হয়েছিল, মঙ্গোলরা যেন নরকের সবচেয়ে গভীর অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে এসেছে। কোনো গল্পকেই তখন আর অবিশ্বাস্য মনে হতো না। বিস্তীর্ণ জনপদ ধ্বংস করে এগিয়ে চলার পথে মঙ্গোলদের দেখা হতো সক্ষাত খোদার গযব হিসেবে।
যদিও এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে এই ধারণাটি আজও চেঙ্গিস খানের সেই বহুল প্রচলিত উক্তিটির মাধ্যমে টিকে আছে:
"আমি খোদার গজব... তোমরা যদি বড় বড় পাপ না করতে, তবে তিনি আমার মতো কোনো শাস্তিকে তোমাদের ওপর পাঠাতেন না।”
\\=\\
ধ্বংসের এক অনিবার্য আতঙ্ক চারপাশ থেকে চেপে বসেছিল। মানুষের মনে ইমাম মাহদি ও ঈসা মসীহের আগমনের ধারণাগুলো ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। ধূমকেতুর দেখা মেলা, ভূমিকম্প কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে মানুষ দ্রুতই কেয়ামতের অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নিতে শুরু করে।
এরই মধ্যে, বিলাদে শামে পুরোদমে আগ্রাসন শুরু করে মঙ্গোলরা। তাদের লক্ষ্য ছিল মিসরে প্রবেশ করা এবং সেখান থেকে ইসলামের একেবারে কেন্দ্রভূমি আরব উপদ্বীপে আঘাত হানা।
কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিল, গোটা বিশ্বকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া এবং কেয়ামতের সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করা থেকে মঙ্গোলদের বুঝি আর কেউই রুখতে পারবে না। অথচ, যখন ইসলামি সভ্যতা খাদের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই হোঁচট খায় মঙ্গোল আগ্রাসন।
বাগদাদ পতনের পর দামেশকে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় হালাকু খান। এরপর শুরু হয় মিসর দখলের প্রস্তুতি। উত্তর আফ্রিকার বাইরে তখন একমাত্র স্বাধীন মুসলিম ভূখণ্ড হিসেবে টিকে ছিল মিসরের মামলুক সালতানাত। হালাকু খান মামলুক রাজধানী কায়রোতে দূত পাঠিয়ে তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানান।
জবাবে মামলুক সুলতান সাইফউদ্দীন কুতুজ সেই দূতদের শিরশ্ছেদ করেন। তাদের কাটা মাথা ঝুলিয়ে রাখা হয় কায়রোর প্রবেশদ্বারে। হালাকু খানের সাথে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে কুতুজ তার মামলুক বাহিনীকে সংঘবদ্ধ করেন। ঠিক এই মুহূর্তটিতেই ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায়।
১২৫৯ সালে তৎকালীন মঙ্গোল শাসক মংকে খানের মৃত্যুতে হালাকু খান তার বিশাল বাহিনীর বড় একটি অংশ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে বাধ্য হন। মঙ্গোলিয়ায় ফিরে গিয়ে নতুন শাসক নির্বাচনের জন্য মঙ্গোলদের সর্বোচ্চ পরিষদ বা 'কুরুলতাই'-এ যোগ দেওয়া তার জন্য তখন জরুরি ছিল। যাওয়ার আগে তিনি তার অন্যতম সেনাপতি কিতবুকাকে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে যান।
ঠিক এক বছর পর, ১২৬০ সালে, 'আইন জালুত'-এর প্রান্তরে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখানেই মঙ্গোলরা তাদের ইতিহাসের প্রথম পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। মামলুক বাহিনীর হাতে কিতবুকা নিহত হন এবং তার বাহিনী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
মঙ্গোলদের এই পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল হালাকু খানের পশ্চিম এশিয়া ত্যাগ। তাছাড়া মামলুকরা নিজেরাও ছিল যাযাবর বংশোদ্ভূত। ফলে স্তেপ অঞ্চলের অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশল তাদের কাছে খুব একটা অপরিচিত ছিল না। মঙ্গোলদের সামরিক কৌশল তাই তাদের ভড়কে দিতে পারেনি।
\\=\\
হালাকু খান আইন জালুতের এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে তাকে সম্পূর্ণ নতুন এক হুমকির মুখোমুখি হতে হয়।
তার আপন চাচাতো ভাই এবং 'গোল্ডেন হোর্ড' সাম্রাজ্যের শাসক বারকে খান ততদিনে ইসলাম কবুল করেছেন। বাগদাদ ধ্বংস এবং খলিফাকে হত্যার ঘটনায় বারকে খান প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি মামলুকদের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলেন এবং হালাকু খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই গোল্ডেন হোর্ডের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলাকালেই ১২৬৫ সালে হালাকু খানের মৃত্যু হয়।
১২৬০ সালের পর মামলুক শাসিত মিসরে মঙ্গোলরা বিক্ষিপ্তভাবে আরও বেশ কয়েকবার আক্রমণের চেষ্টা করে, কিন্তু কখনোই আর সফল হতে পারেনি। ততদিনে হাওয়া বদলে গেছে। আইন জালুতের প্রান্তরে মামলুকদের বিজয় এবং বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ এমন এক বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত খোদ মঙ্গোল সাম্রাজ্যকেই পাল্টে দেয়।
....
ক্রিটিকালি চিন্তা করে দেখেন, কেন, আর কীভাবে মামলুকরাই মোঙ্গলদের ঠেকাতে পারলো, অন্যরা নয়? ৪২ বছরের মোঙ্গল ত্রাসের ইতিহাসে একদম শুরু, আর শেষের মধ্যে একটা কাকতালীয় মিল আছে। সেখানেই পাওয়া যাবে উত্তর।
(চলবে...)
তথ্যসূত্র:
আতা-মালিক জুভায়নি (Genghis Khan: The History of the World Conqueror - মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞ ও 'খোদার গজব' উক্তির ঐতিহাসিক বিবরণ)
ডেভিড মরগান (The Mongols)
পিটার জ্যাকসন (The Mongols and the Islamic World)
রিউভেন আমিতাই-প্রিস (Mongols and Mamluks: The Mamluk-Ilkhanid War)
ম্যারি ফক রেস্তাইন (The Mongols and the Mamluks)

No comments:
Post a Comment